নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না – সামারুহ মির্জা

আমার পিতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ। আমি এই মানুষটি এবং অন্য আরও কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু কথা লিখছি। নিজের পিতাকে নিয়ে লেখা বোধ হয় খুব শোভন নয়! আপাতদৃষ্টিতে এই অশোভন কাজটি আমি আজ করতে চাই, এবং করব।
মির্জা আলমগীরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে শ্রদ্ধা করেছেন সব সময়। এলাকায় যেকোনো বিপদ আপদে প্রথমে ছোটে তাঁর কাছে, সমাধানের জন্য। সে যে দলেরই হোক না কেন, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন।বলুকাকার একটি কথা মনে পড়ে গেল। নির্বাচনী প্রচারণায় আমি হাঁটছি এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায়। বলুকাকার বাসার সামনে এসেছি, সঙ্গে থাকা দুজন বললেন, ভিতরে যাবার দরকার নেই, তিনি আব্বুর বিরুদ্ধে প্রচারণা করছেন। আমি তবুও এগিয়ে গেলাম। ঘরে ঢুকতেই দেখি বলুকাকা আর কজন বসে। বললাম, বলুকাকা, আব্বুর জন্য প্রার্থনা করবেন। বলুকাকা হেসে বললেন, মাগো, রাজনৈতিক কারনে আমি তোমার বাবার বিরোধিতা করছি, কিন্তু মানুষ আলমগীরের জন্য আমার মঙ্গল কামণা নির্ভেজাল, সব সময়।আমার এই বাবার বিরুদ্ধে এই সরকার দুটি আজব মামলা দিয়েছে। একটিতে অভিযোগ, আব্বু এবং আরও কজন মিলে সচিবালয়ে ককটেল ফুটিয়েছে বা ফোটাতে সহযোগিতা করেছে, আরেকটিতে অভিযোগ, তাঁর এবং আরও কজনের প্ররোচনায় ২৯শে এপ্রিল একটি বাস পোড়ানো হয়েছে।
এই স্যার আজ আর প্রতিবাদ করছেন না, গর্জে উঠছেন না, মিছিলে যাচ্ছেন না। উনি দেখছেন, সেই একই পুলিসি রিমান্ডে রাজনৈতিক নেত্রীকে চার পেয়ে পশুর মতো অত্যাচার করা হচ্ছে, মেয়েটি দাঁড়াতে পারছে না, সেই একই রিমান্ডে মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, সেই একই বাহিনী রাতে অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কারো বাবাকে, কারো স্বামীকে, কারো সন্তানকে, কদিন পরে বুড়িগঙ্গায় ভেসে উঠছে মানুষের হাত, পা। স্যার কিন্তু কিছুই বলছেন না।
বছরের পর বছর ধরে একজন অনির্বাচিত ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে আছেন, তিনি কিছুই বলছেন না। স্যার একটি রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করেন জানি। খুব স্বাভাবিক। প্রতিটি মানুষ রাজনৈতিক। কিন্তু যেকোনো অন্যায় তো অন্যায়ই, যেকোনো অবিচার তো অবিচারই, যেকোনো অত্যাচার তো অত্যাচারই, এসবের তো অন্য কোন নাম নেই, অন্য কোন সংজ্ঞা নেই। তবে? তাঁর এই নীরবতার কারণ কি? স্যারের একটি লেখা পড়লাম, কালের কণ্ঠে। তিনি লিখেছেন তাঁর প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে। সেই লেখাতেও তিনি কয়েকবার উল্লেখ করলেন অন্যায়ের বিরুধধে তাঁর অতীত সংগ্রামের কথা। প্রশ্ন করি তাঁকে, আপনার ভাই যে আদর্শের জন্য জীবন দিয়েছেন তাঁর কতটুকু এই “সোনার বাংলায়” বাস্তবায়িত হয়েছে? প্রশ্ন করি তাঁকে, বর্তমান কে তিনি কিভাবে দেখছেন এবং বর্তমানে তিনি কি করছেন? সংগ্রাম কি চলমান প্রক্রিয়া নয়?
আমি স্যারের কথা উল্লেখ করলাম কারণ আমি মনে করি বাংলাদেশের বেশির ভাগ বুদ্ধিজীবীকে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন। আমাদের আঁতেলরা এক একটি দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে গিয়ে কেমন জানি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হয়ে যান। একটি মার্কা, একটি রঙ তাঁদের অন্ধ করে দেয়। চোখের সামনে সমাজটা নষ্ট হয়ে যায়, চোখের সামনে মানুষগুলো কুঁকড়ে যায়, চোখের সামনে দেশটা বধ্যভূমিতে পরিণত হয়, এদের কিচ্ছু যায় আসে না। (একটু আগেই খবর পেলাম, আনোয়ার স্যার জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মনোনীত হয়েছেন, স্যারের সাম্প্রতিক নীরবতার কারণটা এখন বোধগম্য হোল)!
সোহেল তাজের পদত্যাগের পর একটা ব্যপার আমার কাছে পুরো পরিষ্কার। আমরা সবাই এক একটি সোহেল তাজ। আমরা খুব সাহস, উদ্যোগ নিয়ে নেমে পড়ি সমাজ বদলাবো বলে, ফেসবুকে এমন ঝড় তুলি, সে ঝড়েই যেন উড়ে যায় সব অনাচার, রাজনীতিবিদদের গালিগালাজ করে অর্গাজমের সমপরিমান আনন্দ বোধ করি, অন্যের পিণ্ডি চটকিয়ে দাবি করি, আমিই আলাদা, আমিই শুদ্ধ। তারপর যখন reality bites, দৈত্য গুলো কামড়ে দেয়, তখন গাল ফুলাই, অবুঝ শিশুর মত বলি “আমি তোমার সাথে আর খেলবো না”। বিশাল একটা চিঠি লিখে পালিয়ে যাই আমেরিকা। ব্যস, নাটকের এখানেই সমাপ্তি।
আমার কিছু উচ্চশিক্ষিত বন্ধু আছে, এরা প্রায়ই বিভিন্ন আড্ডায়, ফেসবুকে রাজনীতিবিদের পিণ্ডি চটকায়। খুব ফ্যাশনের কাজ, নিজের নিরপেক্ষতা প্রমানের কি সাংঘাতিক চেষ্টা, অনেক হাত তালি। ভাবখানা এমন “হোলতো ? দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করা শেষ, এবার চলো, শীশা খেতে যাই”। সুবিধাবাদের চূড়ান্ত! রাজনীতিবিদদের গালি দিয়ে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো যায় না, এ সহজ কথাটি আমার উচ্চশিক্ষিত বন্ধুদের মাথায় ঢুকে না, সম্ভবত ইচ্ছাকৃত ভাবেই!
আমার বাবা একটি কথা আজকাল প্রায়ই বলেন, “আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনে একটি অন্যতম মূল ভুমিকা রেখেছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত । পুঁজিবাদ আর ভোগবাদের প্রভাবে এই মধ্যবিত্ত আজ নির্লিপ্ত হয়ে গেছে, সুবিধাজনক বলে”। আর আমার মাথা বলে, এটা খুব ভয়ংকর একটা অবস্থা। কোন নিয়মতান্ত্রিক ভাবে, সভ্যভাবে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। আজ ব্যক্তি মির্জা আলমগীরের উপর যে অন্যায় হলো, যে অবিচার হলো, এর ফল ভোগ করতে হবে পুরো জাতিকে। এ পরিষ্কার। আজ অথবা কাল। নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না।