রাজনীতি

গৌরনদী-আগৈলঝাড়ায় বিএনপির মনোনয়ন ঘিরে স্বপন-কুদ্দুসের দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত রাজনীতি

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া (বরিশাল-১ আসন) উপজেলায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী দুই প্রভাবশালী নেতা—বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপনের—পারস্পরিক আক্রমণাত্মক বক্তব্যে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি একাধিক জনসভায় এই দুই নেতা একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন, যা তাদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

এই দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর সংঘাত যখন আলোচনার কেন্দ্রে, ঠিক তখনই দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহান এবং আইনজীবী কামরুল ইসলাম সজলের নামও শোনা যাচ্ছে। একাধিক প্রার্থীর তৎপরতা দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে, যা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা সৃষ্টি করেছে।

পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

গত ৭ আগস্ট গৌরনদীর এক সমাবেশে জহির উদ্দিন স্বপন প্রতিপক্ষের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “দলের ভেতরে যদি মাদক ব্যবসায়ী বা গডফাদারদের আশ্রয় দেওয়া হয়, আমরা কি তা মেনে নেব? গৌরনদী-আগৈলঝাড়ায় বিএনপির কোনো গডফাদারের আধিপত্য চলবে না। সময় হলেই আমি ডাক দেব।”

এর জবাবে আকন কুদ্দুসুর রহমান এক সমাবেশে বলেন, “আপনার এক পাশে জাতীয় পার্টি, অন্য পাশে আওয়ামী লীগ। ভোটারবিহীন নির্বাচনের অবৈধ চেয়ারম্যান পিকলু গুহকে আপনি আশ্রয় দেন, আপনার লজ্জা করে না? আমি বলতে চাই, মৌচাকে ঢিল দেবেন না।”

কুদ্দুস আরও যোগ করেন, “ওয়ান-ইলেভেনের সময় যারা বিএনপিকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র করেছিল, তারা আজ আবার সক্রিয় হয়েছে। এরা দলের অভিভাবক হতে পারে না।”

দুই নেতার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

জহির উদ্দিন স্বপন ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ‘হরিণ’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং মাত্র ১৬০ ভোট পান। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি বিএনপির রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন এবং বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা শোনা যায়।

অন্যদিকে, আকন কুদ্দুসুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকলেও একাধিকবার চেষ্টা করেও মনোনয়ন লাভে ব্যর্থ হন। স্থানীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে ‘মেজাজি’ আচরণের অভিযোগ থাকলেও কর্মীদের মাঝে তিনি বেশ জনপ্রিয় এবং আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

স্থানীয় নেতাদের উদ্বেগ

এই দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে গৌরনদী উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক বদিউজ্জামান মিন্টু বলেন, “গৌরনদীতে কোনো গডফাদার নেই। স্বপন ভাই সম্ভবত আওয়ামী লীগ আমলের কুখ্যাত ব্যক্তিদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। আর কুদ্দুস ভাই হয়তো কিছুটা মনোকষ্ট থেকে এমন মন্তব্য করেছেন। আমি আশাবাদী, দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে এই বিরোধ আর থাকবে না।”

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় নেতা জানান, নির্বাচনের আগে দুই শীর্ষ নেতার এই সংঘাত দলকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলবে। এর ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যেতে পারে। তাদের মতে, “যারা দীর্ঘদিন এলাকার রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তারা এখন অন্য দলের লোকজনকে নিয়ে নিজেদের বলয় ভারী করছেন, যা দলের জন্য একটি অশনিসংকেত।”

শেষ কথা

জহির উদ্দিন স্বপন তার ‘গডফাদার’ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলেন, “আমি তাদের কথাই বলেছি, যারা অতীতে হাসানাত বা হারিছ চৌধুরী ছিলেন। এখন বিএনপিতে যদি কেউ সেই ভূমিকা নিতে চায়, তাহলে তো তাদের গায়ে লাগবেই।” ওয়ান-ইলেভেন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলে কুদ্দুস প্রকারান্তরে দলের চেয়ারপারসনকেই বিতর্কিত করছেন।”

অন্যদিকে, আকন কুদ্দুস পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, “স্বপনই গডফাদার ও মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষক। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী পৌর বিএনপিতে চাঁদাবাজির অভিযোগে বহিষ্কৃত। ওয়ান-ইলেভেনে যদি তিনি জড়িত না-ই থাকবেন, তবে এতদিন দলের বাইরে কেন ছিলেন?” তিনি আরও বলেন, “‘ধানের শীষ’-এর সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে, তারা দলে টিকতে পারে না।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বরিশাল-১ আসনে বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল দ্রুত নিরসন করা না গেলে, তার নেতিবাচক প্রভাব ভোটের রাজনীতিতে পড়তে বাধ্য।

Back to top button