বরিশাল

ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগে তোলপাড়

মেঘনা নদীঘেরা বরিশালের হিজলা উপজেলায় সদ্য সমাপ্ত ‘মা ইলিশ রক্ষা অভিযান’ এবার চরম ব্যর্থতার মুখে পড়েছে। মৎস্য সমিতি ও স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা মৎস্য বিভাগ অভিযান পরিচালনা করলেও কার্যত তা ছিল লোকদেখানো, আর নদীতে অবাধে চলেছে মা ইলিশ নিধন ও বেচাকেনা।

অভিযোগ রয়েছে, মৎস্য বিভাগ প্রকাশ্যে জেলেদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নিয়ে বরং প্রভাবশালী মাছঘাট মালিকদের সঙ্গে গোপনে সমঝোতায় জড়িয়েছে। ফলে নদীতে প্রতিদিনই হাজারো জেলে নৌকা নিয়ে প্রকাশ্যে মাছ ধরেছেন এবং প্রতিটি বাজারে কোটি টাকার ইলিশ বেচাকেনা হয়েছে।

মৎস্য সমিতির নেতাদের দাবি, এবারের অভিযান শতভাগ ব্যর্থ হয়েছে। মৎস্য বিভাগের ঘোষণা ও আড়ম্বরপূর্ণ “ড্রোন টহল” ও “জলকামান” ব্যবহারের প্রচারণা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ ছিল।

“টোকেনের বিনিময়ে” ইলিশ নিধনের অনুমতি

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের কাছ থেকে প্রতিদিন এক হাজার টাকা করে আদায় করে ‘টোকেন’ দেওয়া হয়। এতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে প্রতিজন জেলে ২২ হাজার টাকার বিনিময়ে মা ইলিশ ধরার বৈধতা পান। যাদের টোকেন ছিল না, শুধু তাদেরকেই অভিযানে আটক করা হতো।

জেলের স্ত্রীর কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ

অভিযানের অনিয়মের পাশাপাশি এবার সামনে এসেছে ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগও। হিজলা উপজেলার বড়জালিয়া ইউনিয়নের জেলে মো. রুবেল হোসেনের স্ত্রী মোছা. রহিমা বেগম অভিযোগ করেছেন, মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আলম তার স্বামীর আটক ট্রলার ছাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরবর্তীতে তিনি ১০ হাজার টাকা প্রদান করেন বলে জানান।

রবিবার (২৬ অক্টোবর) ইউএনও কার্যালয়ে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মী ও কর্মকর্তাদের সামনে রহিমা বেগম এ অভিযোগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ঘুষের বিষয়টি গোপন রাখার জন্য মৎস্য কর্মকর্তা তাকে ভয় দেখান, “কারও কাছে বললে স্বামীকে এক বছরেও ছাড়া হবে না।”

এই অভিযোগ প্রকাশের পর হিজলা উপজেলা জুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। পরে অভিযুক্ত কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের মাধ্যমে অভিযোগটি “ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন” বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইলিয়াস সিকদার বলেন, “ঘটনাটি বিব্রতকর। স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে, বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কান্তি ঘোষ জানান, “সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে টাকা নিয়ে ট্রলার ছেড়ে দেওয়া অবৈধ। অভিযোগ তদন্ত করা হবে, প্রমাণ মিললে দাপ্তরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মৎস্য সমিতির মন্তব্য

জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন মাতুব্বর বলেন, “এবারের নিষেধাজ্ঞা ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যর্থ অভিযান। মৎস্য বিভাগ ও মাছঘাট মালিকরা মিলে সরকারের নির্দেশনা ভণ্ডুল করেছে।”

তিনি আরও বলেন, “মৎস্য বিভাগ কাগজে-কলমে সফলতা দেখালেও বাস্তবে মা ইলিশ রক্ষায় সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীতীরের মাছঘাটগুলো নিয়ন্ত্রণ না করলে কখনোই সফল অভিযান সম্ভব নয়।”

Back to top button